Wednesday, August 22, 2012


দানাদার ডাঁটা

মৃত্যুঞ্জয় রায়
দানাদার ডাঁটা আমেরিকায় এক হারিয়ে যাওয়া ফসল। প্রায় আট হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর বুকে দানাদার ডাঁটা চাষ হচ্ছে। কয়েক হাজার বছর আগে প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতায়ও আমেরিকানদের কাছে দানাডাঁটার দানা ছিল প্রধান খাদ্য। ভাতের মতো তারা এর দানা রেঁধে খেত। মেক্সিকোয় পনেরো শতকে স্প্যানিশ বিজয়ের পর আমেরিকানদের খাবার টেবিল থেকে ধীরে ধীরে এই খাবার উঠে যায়। বহুকাল সেভাবেই এ ফসলটি হারানো ছিল। আমেরিকায় ফসল হিসেবে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে গবেষণার বিষয় হিসেবে আবার সেই হারিয়ে যাওয়া ফসলটি ফিরে আসে। এরপর ধীরে ধীরে দানার জন্য চাষ হতে থাকে আফ্রিকা, ভারত ও নেপালে। গত দুই দশকে চীন, রাশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপে এর চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গত কয়েক বছরে আমাদের দেশেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এ ফসলটি নিয়ে গবেষণা করে এ দেশে চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এক জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধে এই ফসলকে ‘আগামী দিনের ফসল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা গ্রামাঞ্চলে এ ফসল চাষে তেমন কোনো খরচ হয় না, সহজে ফসল সংগ্রহ ও মাড়াই করা যায়, ধানের মতো চাষ করতে বেশি পানি লাগে না, শুষ্ক পরিবেশেও চাষ করা যায়, ধানের চেয়ে এর দানায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি প্রোটিন আছে এবং সহজে রান্না করা যায়। 
দানাডাঁটার গাছ দেখতে অনেকটা মোরগজবা ফুলগাছের মতো। সারা বিশ্বে Amaranthus গনের প্রায় ৬০টি প্রজাতি রয়েছে। দানাডাঁটার রয়েছে তিনটি প্রজাতি, যারা কাউনের ছড়ার মতো বড় ছড়া উৎপন্ন করে ও সেসব ছড়ার দানা খাওয়া যায়। এগুলো হলো Amaranthus hypochondriacus, A. cruentus ও A. caudatus প্রথমোক্ত প্রজাতি বেশি চাষ হয় যুক্তরাষ্ট্রে। দানাডাঁটার গাছ প্রায় ০.৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা বড় ও চওড়া, প্রচুর ফুল লম্বা দোলানো ছড়ায় গাদাগাদি করে ফোটে। পুষ্পমঞ্জরি ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রজাতি ও জাতভেদে পুষ্পমঞ্জরির রঙ মেরুন, সবুজ ও হলুদ বা সোনালি হয়ে থাকে। পাতার রঙও কমলা, সবুজ ও লালচে হয়ে থাকে। তবে মেরুন রঙ প্রায় সবগুলো প্রজাতিতেই থাকে। ফুল ফোটা অবস্থায় গাছ দেখতে খুব সুন্দর দেখায়। পুষ্পমঞ্জরি নিচের দিকে ঝুলতে থাকে। কিছু কিছু পুষ্পমঞ্জরি আগা ছাড়া নিচের পত্রকক্ষেও উৎপন্ন হতে দেখা যায়। গাছ খরা সইতে পারে। 
ব্যবহার
দানাডাঁটার গাছ ডাঁটাগাছের মতোই দেখতে, তবে এর পাতা বা ডাঁটা খাওয়া হয় না। চিনা বা কাউনের মতো এর বীজ বা দানা রেঁধে খাওয়া যায়। ভাত হিসেবেও খাওয়া যায়। এর বীজ দিয়ে খই ভাজা যায়, ময়দা তৈরি করা যায়। খইয়ের সাথে গুড় মাখিয়ে লাড্ডু ও মোয়া বানানো হয়। ভারতে এই লাড্ডু খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এ জন্য ডাঁটার দানাকে কখনো কখনো pseudocereal নামে অভিহিত করা হয়। 
পুষ্টিমূল্য
দানাডাঁটার অন্যতম আকর্ষণ হলো এর বীজ বা দানা, যার রঙ সোনালি ও অত্যন্ত পুষ্টিকর। শিমের বিচি ছাড়া আর কোনো অশিম বীজে দানাডাঁটার বীজের মতো প্রোটিন নেই। এর বীজে প্রোটিনের পরিমাণ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। শুধু প্রোটিনই নয়, এর আঁশও বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম রান্না না করা দানায় আছে কার্বোহাইড্রেট ৬৫ গ্রাম, চিনি ১.৭ গ্রাম, আঁশ ৭ গ্রাম, চর্বি ৭ গ্রাম, প্রোটিন ১৪ গ্রাম, পানি ১১ গ্রাম, ভিটামিন বি১ ০.১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.২ মিলিগ্রাম, নায়াসিন বা ভিটামিন বি৩ ০.৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি৬ ০.৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি৯ ৮২ মাইক্রোগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৫৯ মিলিগ্রাম, আয়রন ৭.৬ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ২৪৮ মিলিগ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ ৩.৪ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ৫৫৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৫০৮ মিলিগ্রাম, জিঙ্ক ২.৯ মিলিগ্রাম। ডাঁটাবীজের দানা সম্পূর্ণ গ্লুটেনিন মুক্ত। চালে গ্লুটেনিন আছে। যাদের গ্লুটেনিন অ্যালার্জি আছে তারা নিশ্চিন্তে ডাঁটার দানা দিয়ে ভাত রেঁধে বা এর ময়দা দিয়ে রুটি বানিয়ে খেতে পারেন।
চাষাবাদ
দানাডাঁটার চাষ ডাঁটার মতোই। জমি চাষ দিয়ে সমতল করতে হবে। যেকোনো মাটিতেই এর চাষ করা যায়। তবে যেখানে পানি জমে না ও উর্বর, সেরূপ মাটিতে ভালো হয়। গম কাটার পর সে জমিতে দানা ডাঁটার চাষ করা যায়। যে জমিতে দানাডাঁটার চাষ করা হবে সে জমিতে দুই বছর পর আবার দানাডাঁটার চাষ করা উচিত হবে। এর মধ্যে সেই জমিতে সয়াবিন বা ভুট্টা চাষ করা যেতে পারে। 
বীজতলায় বীজ বুনে চারা তৈরি করে তারপর মূল জমিতে সেসব চারা লাগাতে হবে। এর চারা ভুট্টা বা সয়াবিনের চারার মতো শক্ত নয়, বেশ নরম। তাই চারা তোলা ও লাগানোর কাজ খুব সাবধানে করতে হবে। প্রতি একর জমি চাষের জন্য ১ কেজি বীজ লাগবে। বীজ বোনার সময় হলো মার্চ-মে মাস। এর পরে বীজ বুনলে ফলন কমে। সারিতে চারা লাগাতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৭৫ সেন্টিমিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ৫০-৬০ সেন্টিমিটার। এর জন্য ভুট্টার মতো বেশি পরিমাণে ইউরিয়া সার দেয়ার দরকার নেই। একরে মাত্র ২০ থকে ৪০ কেজি ইউরিয়া সার যথেষ্ট। চারা লাগানোর কয়েক দিন আগেই জমি চাষের সময় এই সার ছিটিয়ে দেয়া যায়।
ফসল কাটা ও সংরক্ষণ
অক্টোবরে ফসল পেকে গেলে ছড়া কেটে সংগ্রহ করতে হবে। উঠানে পলিথিন বিছিয়ে তাতে ছড়াগুলো বিছিয়ে ভালো করে রোদে শুকিয়ে পিটিয়ে বীজ ছাড়াতে হবে। ছেড়ে পরিষ্কার করে দানা আলাদা করে ড্রামে বা পলিথিনের বস্তায় সংরক্ষণ করতে হবে। গুদামে রাখার সময় বীজে বা দানায় ১০-১২ শতাংশের বেশি আর্দ্রতা থাকা উচিত নয়।

Thursday, August 9, 2012


আরনেট নিউজ : বাংলাদেশ পুষ্টি এবং খাদ্য বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ মতে, প্রতিটি মানুষের প্রতিদিন গড়ে ১১২ গ্রাম ডাল শস্য গ্রহণ করা উচিত। এ হিসাবে আমাদের বছরে ৫ মিলিয়ন টন ডাল শস্যের প্রয়োজন। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা কর্তৃক প্রণীত সুষম খাদ্য তালিকায় প্রতিটি মানুষের দৈনিক ৫৮ গ্রাম ডাল শস্য থাকা প্রয়োজন। একজন মানুষের জন্য প্রতিদিন গড়পরতা ২ হাজার ৩০০ কিলোক্যালোরি শক্তি প্রয়োজন। সাধারণত দানা ও শর্করা জাতীয় খাদ্য, ডাল শস্য, সবজি, ফল, তেল জাতীয় খাদ্য এবং প্রাণীজ খাদ্য এ শক্তি জোগায়।
মসুর ডালের আবাদ কৌশল:
পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা আছে এমন বেলে দোআঁশ এবং এঁটেল মাটি মসুর চাষের জন্য উপযোগী। মাটির অম্লান (পিএইচ) ৬.৫-৭.৫-এর মধ্যে হলে ভালো হয়। মসুর খরা সহিষ্ণু ফসল এবং বৃষ্টিনির্ভর এলাকায় ভালো জন্মে। জলবায়ুগত বিচারে রবি মৌসুম বাংলাদেশে মসুর চাষ করার উপযোগী। মধ্য অক্টোবর থেকেই এর বপন কাজ শুরু হয় এবং মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়। মসুর বীজ যথাসময়ে বপন না করলে ফলন বেশ কমে যায়।
জাত: উৎফলা (এল-৫) একটি অনুমোদিত জাত।
জমি তৈরি:
মসুরের বীজ আকারে ছোট বলে জমি বেশ ঝুরঝুরে এবং নরম করে তৈরি করতে হয়। আগাম জাতের ধান বা পাট কেটে নেয়ার পর জো এলে জমিতে ৩-৪ বার সোজাসুজি ও আড়াআড়িভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করতে হয়। পলি মাটিতে বর্ষার পানি চলে যাওয়ার পর বিনা সেচেও মসুরের চাষ করা যায়। মসুর গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না বলে জমি তৈরির সময়ই নালা কেটে পানি সেচের ব্যবস্থা রাখতে হয়।
সার প্রয়োগ:
নদীর অববাহিকা অঞ্চলের পলি মাটি স্বভাবতই উর্বর বলে এরূপ জমিতে মসুর চাষ করতে জৈব সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য অঞ্চলের বেলে দোআঁশ বা এঁটেল দোআঁশ মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা বাড়ানো যায়। এ ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৫-৭ টন খামারে পচানো সার জমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া হেক্টর প্রতি ৬৬-৮৮ কেজি ইউরিয়া সার এবং ১৮৮-২৫০ কেজি সিঙ্গেল সুপার ফসলেট (ঝঝচ) প্রয়োগ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। শেষ চাষের সময় এসব সার জমিতে ছিঁটিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। মাটিতে সামান্য পরিমাণ কোবাল্ট ও মলিবডেনাম নামক গৌণ খাদ্যোপাদানের উপস্থিতিতে মিথোজীবী, ব্যাকটেরিয়াগুলোর বংশ বৃদ্ধি ঘটে, যার ফলে মাটিতে নাইট্রোজেন বন্ধন বেশি হয়। সুতরাং হালকা মাটিতে ওই সারের সঙ্গে হেক্টর প্রতি ২ কেজি সোডিয়াম মলিবডেট এবং এক কেজি কোবাল্ট নাইট্রেট মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
বীজ বপন:
মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর মসুর বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। ছিঁটিয়ে বা সারিতে উভয় পদ্ধতিতে বীজ বপন করা গেলেও মসুরের ফলনে তেমন কোনো পার্থক্য না থাকায় সাধারণত শেষ চাষের সময় বীজ ছিঁটিয়ে বপন করা হয়। তবে সারিতে বপন করতে চাইলে ৩০ সে. মি. দূরত্বে সারি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৩০-৩৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়। জমিতে নাইট্রোজেন গুঁটি উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া কম থাকলে বপনের আগে উপযুক্ত ইনোকুলাম প্রয়োগ করলে ফলন বৃদ্ধি পায়। তবে জমিতে এর আগে মসুর চাষ করা হয়ে থাকলে প্রাথমিক ইউরিয়া এবং জীবাণু সার প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না।
আন্তঃপরিচর্যা:
বীজ বোনার ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন করতে হয়। গাছ ঘন থাকলে পাতলা করা যেতে পারে। সাধারণত বাংলাদেশে মসুর ফসলে সেচ প্রয়োগ করা হয় না। তবে মাটিতে রসের অবস্থা বুঝে সেচ দেয়া উত্তম। মরিচা পড়া এবং নেতিয়ে পড়া রোগ দুটি মসুরের বেশ ক্ষতি করে থাকে। ভিটাভ্যাক্স ৪০০ (১:৪০০ হারে) দ্বারা বীজ শোধন করে বপন করে গোড়া পচারোগ দমন করা যায়। দেরি না করে সময় মতো বীজ বপন করলে মরিচা পড়া রোগ দমন করা সম্ভব।
সাথী ফসল:
গম, আখ, ভুট্টা এবং সরিষার সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে মসুরের চাষ করা যায়। এছাড়া এ দেশে সরিষার সঙ্গেও মিশ্র ফসল হিসেবে মসুর চাষের প্রচলন রয়েছে।
ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণ:
সাধারণত বীজ বপনের ৯০-১০০ দিনের মধ্যেই মসুর ডালে পরিপক্বতা আসে এবং মাঠের ৮০ ভাগ ফল পরিপক্বতা লাভ করলে ফসল সংগ্রহ করা যায়। জাত অনুসারে হেক্টর প্রতি ১.৫-২.০ টন দানা পাওয়া যায়। বীজ সংগ্রহ করার পর ভালো করে রৌদ্রে শুকিয়ে মাটির পাত্রে, টিনে, ড্রামে এমনভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে বাতাস বা কীটপতঙ্গ ঢুকতে না পারে। পোকার আক্রমণ হয়েছে কিনা দেখার জন্য বর্ষাকালে মাঝে মাঝে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

Thursday, August 2, 2012



মনিরামপুরে গ্রীষ্মকালীন টমেটো নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে

লেখক: মণিরামপুর  বৃহস্পতিবার, ২ অগাষ্টu-এ ২০১২, ১৮ শ্রাবণ ১৪১৯
Details
যশোরের মনিরামপুরে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষকৃত উফশী জাতের বারী-৪ গ্রীষ্মকালীন টমেটো বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখানকার আবহাওয়া ও জলবায়ু টমেটো চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী হওয়ায় সবজি চাষে সফলতার নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। সে কারণেই রমজান মাসকে টার্গেট করে টমেটো চাষ শুরু করে এখানকার চাষিরা।
শীতকালীন সবজি হিসেবে টমেটো উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে চাষাবাদ হয়ে থাকে। আর সালাদ ও রকমারি খাবারের রসনা মেটাতে টমেটোর অভাব গ্রীষ্মকালে তীব্র হয়। তবে সে অভাব দূর করছে মনিরামপুরে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ শুরু হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী উপজেলার কাশিপুর, শ্যামকুড়, চণ্ডিপুর গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ হয়েছে, যা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা গ্রীষ্মকালীন এ ফসলের চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
এসব জমিতে উফশী জাতের বারী-৪ গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ হচ্ছে। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বীজ বপন করা হয়। ২০ দিন বয়সের চারাগাছ উঠিয়ে তৈরিকৃত অপেক্ষাকৃত উঁচু সমতল জমিতে লাগানো হয়। চারাগাছ লাগানোর ৬০-৬৫ দিনের মধ্যে টমেটো গাছে ফল আসা শুরু করে। সফল চাষি আজিজুর রহমানের সঠিক পরিচর্যায় গ্রীষ্মকালীন টমেটো গাছে ফল আসতে শুরু করেছে। ৫ শতক জমিতে টমেটো চাষ করেছেন তিনি। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তার মোট খরচ হবে ২০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে তিনি প্রায় ৪ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি করেছেন। ওই জমি থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকার টমেটো বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।

Wednesday, August 1, 2012



টবে ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপি চাষ

আরনেট নিউজ ডেস্ক : ব্রোকলি। একটা উৎকৃষ্ট সবজি, তবে মাঠ থেকে তোলার পর তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায় বলে টবে চাষ করতে পারলে ভাল হয়। ব্রোকলিতে ভিটামিন সি, ক্যারোটিন ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেশি আছে। এছাড়া অন্যান্য খাদ্য উপাদান রয়েছে অল্প পরিমাণে।
জাত :
আমাদের দেশে এল সেন্ট্রো, ডি সিক্কো, প্রিমিয়াম ক্রস, গ্রীন কমেট ইত্যাদি জাতের ব্রোকলি পাওয়া যায়।
সময়: আশ্বিন-অগ্রহায়ণ (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) চাষের সময়।
বীজ থেকে চারা তৈরি :
বীজ থেকে চারা তৈরি করে মূল টবে লাগাতে হবে। বীজ গজাতে সময় লাগে ৩/৪ দিনে। ৮/৯ দিন বয়সের চারা তুলে অল্প দূরত্বে আরেকটি বীজতলার টবে লাগাতে পারলে শক্তিশালী চারা পাওয়া যাবে।
সার ও মাটি :
গোবর, টিএসপি ও খৈল দিয়ে সার-মাটি তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে মাটি সব সময় নরম তুলতুলে থাকলে গাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে।
চারা রোপণ :
৩/৪ সপ্তাহের সুস্থ চারা সার-মাটি ভরা টবে লাগতে হবে। চারা লাগাতে হবে
বিকাল বেলাতে। চারা লাগানোর পর গোড়ায় মাটি খুব হালকা করে চেপে দিতে হবে। কেননা জোরে চাপ দিলে নরম শিকড় ছিঁড়ে যেতে পারে।
পরিচর্যা :
ব্রোকলির চারা লাগানোর প্রথম ৩/৪ দিন চারাকে ছায়া দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে
এবং চারা না লেগে যাওয়া পর্যন্ত সকাল-বিকাল পানি দিতে হবে। চারা লেগে গেলে মাঝে মাঝে মাটি একটু খুঁচিয়ে দিতে হবে এবং ২/১ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। গাছ একটু বড় হলে ১৫ দিন পরপর তরল সার বা পাতার সার দিলে ভাল হয়। পরে গোড়ার মাটি চারদিক থেকে তুলে দিতে হবে এবং টবের কিনার বরাবর সেচ দিতে হবে।
ক্ষতিকর পোকা : শুঁয়া পোকা ও জাব পোকা ব্রোকলির ক্ষতি করে।
প্রতিকার :
জাব পোকা বেশি হলে রিডেন ও শুঁয়া পোকা বেশি হলে মার্শাল ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে সহকারি উপ-কৃষি কর্মকতার পরামর্শ অনুযায়ী। যদি শুঁয়া পোকা এবং জাব পোকা একসাথে আক্রমণ করে তাহলে নাইট্রো ওষুধ স্প্রে করা যেতে পারে।
ফসল সংগ্রহ :
ব্রোকলির চারা রোপণের পর ৩ থেকে সাড়ে ৩ মাসের মধ্যে সবজিটি খাবার উপযোগী হয়। ব্রোকলির কাণ্ডের শাঁস খুব নরম হয় বলে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। ফুল ২/৩ সপ্তাহ হলে খাওয়ার উপযোগী হয়। ফসল সংগ্রহের সময় প্রথমে উপরের ফুলটি কেটে নিয়ে গাছটি বাড়তে দিলে নিচের পাতার গোড়া থেকে আবার ফুল বের হবে যা পরবর্তীতে সময়মত সংগ্রহ করা যাবে

বটতৈল টাকিমারায় মেশিনের সাহায্যে ধান রোপন

কৃষি প্রতিবেদক \ গতকাল মঙ্গলবার কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বড়িয়া-টাকিমারায় মেশিনের সাহায্যে আমন ধান রোপণ প্রযুক্তি প্রদর্শিত হয়েছে। ওই ব্লাকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোল্লা হাফিজের তত্বাবধানে বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনষ্টিটিউটের প্রদর্শনী প্লটে মেশিনের সাহায্যে ধান রোপণ করা হয়। স্থানীয় কৃষক আবেদ মন্ডলের ১০ কাঠা জমিতে এ প্রদর্শনী প্লট করা হয়। মেশিনের সাহায্যে ধান রোপনের সুফল, আর্থিক লাভ এবং সময় শাস্রয় সম্পর্কে উপস্থিত শতাধিক কৃষককে মাঠ প্রশিক্ষণ দেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোল্লা হাফিজ।

Tuesday, July 31, 2012



পেয়ারার ডাল বাঁকালেই ফলন দশগুণ! ফল ধরবে বারো মাস!

image_103_39321
ডাল বাঁকালেই ফলন দশগুণ। তা ছাড়া একই প্রযুক্তিতে বছরের বারো মাসই ফল ধরানো সম্ভব। ফলের মৌসুমে গাছের ফুল ছিঁড়ে দিয়ে এ প্রক্রিয়াকে আরো প্রভাবিত করা যায়, যার ফলে সারা বছরই ফলের মৌসুমের তুলনায়্র আট থেকে দশগুণ বেশি ফল ধরবে গাছে। পেয়ারা গাছের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ২৭ মাস গবেষণার পর সম্পূর্ণ নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্পর্কে এই তথ্য দিলেন বাউকুল উদ্ভাবক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ রহিম।
উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্পর্কে ড. রহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত বর্ষা ও শীত_এই দুই ঋতুতে গাছে পেয়ারা হয়। তবে শীত অপেক্ষা বর্ষাকালে ফলন একটু বেশি হয়। বর্ষাকালে জলীয় ভাব বেশি থাকায় ফলের মিষ্টতা ও অন্য গুণাগুণ শীতকালের ফলের থেকে অনেকাংশেই কম থাকে। তা ছাড়া জলীয় ভাব বেশি থাকায় পাকা ফল তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়, ফলে দাম থাকে কম। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সব জাতের পেয়ারার গুণাগুণ শীতকালে বেড়ে যায়, রোগ ও পোকার আক্রমণও কম থাকে। ফলের আকৃতি এবং রং সব দিক থেকেই সুন্দর হওয়ায় এই সময়ে পেয়ারার দামও থাকে বেশি। এসব দিক বিবেচনায় রেখেই বর্ষাকাল বাদে কিভাবে অন্যান্য ঋতুতে অত্যধিক হারে উৎপাদন বাড়ানো যায় সে ব্যাপারে গবেষণা শুরু হয়। এ লক্ষ্যে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে 'গাছের ডাল বাঁকানো' পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রতিটি গাছ থেকে সাধারণের তুলনায় আট থেকে দশগুণ বেশি পেয়ারা উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া পেয়ারার মৌসুমে গাছের ফুল ও ফল ছিঁড়ে দিয়ে এ প্রক্রিয়াকে আরো প্রভাবিত করা যায় বলে জানান তিনি।
এ প্রযুক্তির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জার্মপ্লাজম সেন্টারের প্রধান গবেষণা সহযোগী কৃষিবিদ শামসুল আলম মিঠু কালের কণ্ঠকে বলেন, বছরে দুবার অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে (এপ্রিল-জুন) এবং হেমন্তকালে (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর) শাখা-প্রশাখার নিয়ন্ত্রিত বিন্যাসের মাধ্যমে সারা বছর পেয়ারার ফুল ও ফল ধারণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গাছের বয়স দেড় থেকে দুই বছর হলেই এই পদ্ধতি শুরু করা যাবে এবং পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত এই পদ্ধতিতে ফলন বাড়ানো সম্ভব। ডাল বাঁকানোর ১০-১৫ দিন আগে গাছের গোড়ায় সার ও পানি দেওয়া হয়। ডাল বাঁকানোর সময় প্রতিটি শাখার অগ্রভাগের এক থেকে দেড় ফুট অঞ্চলের পাতা ও ফুল-ফল রেখে বাকি অংশ ছেঁটে দেওয়া হয়। এরপর ডালগুলোকে সুতা দিয়ে বেঁধে তা বাঁকিয়ে মাটির কাছাকাছি কাণ্ডের সঙ্গে অথবা খুঁটির মাধ্যমে মাটিতে বেঁধে দেওয়া হয়। গ্রীষ্মকালে মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন পরই নতুন ডাল গজানো শুরু হয়। নতুন ডাল এক সেন্টিমিটার লম্বা হলে বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। আর হেমন্তকালে নতুন ডাল গজাতে ২০ থেকে ২৫ দিন লাগে।
শামসুল আলম আরো বলেন, ডাল বাঁকানোর ৪৫ থেকে ৬০ দিন পরে ফুল ধরা শুরু হয়। এভাবে গজানো প্রায় প্রতি পাতার কোলেই ফুল আসে। তবে এ সময় টানা বৃষ্টি বা আর্দ্র আবহাওয়া ফলন বৃদ্ধিতে ক্ষতিকারক। এ পদ্ধতিতে সারা বছরই অত্যধিক হারে ফলন পাওয়া যায়। তা ছাড়া ফলের মিষ্টতা বেশি এবং রং ও আকৃতি সুন্দর হওয়ায় পেয়ারার বাজারদরও বেশি পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে ড. রহিম বলেন, এখন পর্যন্ত শুধু পেয়ারা গাছের ক্ষেত্রেই এ গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। তবে অন্য ফলের ক্ষেত্রেও গবেষণা চলছে। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টারে গ্রীষ্মকালে গাছপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ কেজি এবং হেমন্তকালে গাছপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ কেজি পেয়ারার ফলন পাওয়া গেছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় আট থেকে দশগুণ বেশি। তিনি বলেন, কৃষকরা সহজেই এই পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ করে উৎপাদন বাড়াতে পারবেন, যা বাউকুলের মতো পেয়ারাকেও মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তুলবে।

হাইড্রোপনিক পদ্ধতি মাটিবিহীন চাষাবাদ

195881_1
গাছ আছে, ফল আছে, ফুল আছে আপনার প্রিয় আঙিনায়; কিন্তু গাছের নীচে মাটি নেই। ভাবছেন এটা আবার হয় নাকি! হয়। আপনার আঙিনায় মাটি ছাড়াই জন্মাবে প্রিয় ফসল, ফুল, সবজি। মাটির পরিবর্তে পানিতেই জন্মাতে পারবেন টমেটো, লেটুস, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসা, ক্ষিরা, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, এ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমলিস্নকা আরো অনেক ফসল। মাটিবিহীন পানিতে ফসল উৎপাদনের এই কৌশলকে বলে হাইড্রোপনিক যা একটি অত্যাধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে সারাবছরই সবজি ও ফল উৎপাদন করা সম্ভব। এই চাষাবাদে কোনো কীটনাশক বা আগাছানাশক কিংবা অতিরিক্ত সার দেয়ার প্রয়োজন হবে না। তাই অনায়াসে গড়ে তুলতে পারবেন অর্গানিক ফসলের সম্ভার। সমপ্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) -এর বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তিতে চাষাবাদ শুরম্ন করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊধর্্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ.কে. এম. সেলিক রেজা মলিস্নক ১৯৯৭ সালে জাপানে হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এই প্রযুক্তি প্রথম বাংলাদেশে নিয়ে আসেন ২০০৬ সালে। ২০০৭ সালে তিনি বাংলাদেশের জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির গবেষণা শুরম্ন করেন টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস ও স্ট্রবেরি এই ৪টি ফসল নিয়ে। এ গবেষণায় সাফল্যের পর ২০০৮ সালে এর সাথে ক্ষিরা, শসা, গাঁদা ফুল ও বেগুন এবং ২০০৯ সালে বামন সিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকোলি, চন্দ্রমলিস্নকা যোগ করেন। বিজ্ঞানী মলিস্নক এ গবেষণায় ব্যাপকভাবে সাফল্য পান।
তিনি জানান, লাভজনক ফসলের ক্ষেত্রে এ হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাটির পরিবর্তে পানিতে গাছের প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করা হয়। জনবহুল দেশে যেখানে স্বাভাবিক চাষের জমি কম কিংবা নেই সেখানে ঘরের ছাদে বা আঙিনায়, পলি টানেল, নেট হাউজে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি ও ফল উৎপাদন সম্ভব। উন্নত বিশ্বের যেমন : ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, তাইওয়ান, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে বাণিজ্যিকভাবে হাইড্রোপনিক পদ্ধতির মাধ্যমে সবজি ও ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে সারাবছরই সবজি ও ফল উৎপাদন করা সম্ভব এবং উৎপাদিত সবজি ও ফলে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা লাগে না বিধায় এ সবজি ও ফল নিরাপদ এবং অধিক বাজারমূল্য পাওয়া যায়।
সাধারণত দু'ভাবে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়। সঞ্চালন পদ্ধতি এবং সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতি।
সঞ্চালন পদ্ধতিতে গাছের অত্যাবশকীয় খাদ্য উপাদানসমূহ যথাযথ মাত্রায় মিশ্রিত করে একটি ট্যাংকিতে নেয়া হয় এবং পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে ট্রেতে পুষ্টি দ্রবণ সঞ্চালন করে ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রতিদিন অনত্মতপক্ষে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পাম্পের সাহায্যে এই সঞ্চালন প্রক্রিয়া চালু রাখা দরকার। এই পদ্ধতিতে প্রাথমিকভাবে প্রথম বছর ট্রে, পামপ এবং পাইপের আনুসাঙ্গিক খরচ একটু বেশি হলেও পরবর্তী বছর থেকে শুধুমাত্র রাসায়নিক খাদ্য উপাদানের খরচ প্রয়োজন হয়। ফলে দ্বিতীয় বছর থেকে খরচ অনেকাংশে কমে যায়। এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজিং লোহার ট্রের উপর কর্কশিটের মাঝে গাছের প্রয়োজনীয় দূরত্ব অনুসারে যেমন_ লেটুস ২০ দ্ধ ২০ সে. মি. টমেটো ৫০ দ্ধ ৪০ সে. মি. এবং স্ট্রবেরি ৩০ দ্ধ ৩০ সে. মি. দূরত্বে গর্ত করতে হয়। উপযুক্ত বয়সের চারা স্পঞ্জসহ ওই গর্তে স্থাপন করতে হয়। অপরদিকে, সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে একটি ট্রেতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানসমূহ পরিমিত মাত্রায় সরবরাহ করে সরাসরি ফসল চাষ করা হয়।
এই পদ্ধতিতে খাদ্য উপাদান সরবরাহের জন্য কোনো পাম্প বা পানি সঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না। এক্ষেত্রে খাদ্য উপাদান মিশ্রিত দ্রবণ ও তার উপর স্থাপিত কর্কশিটের মাঝে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। কর্কশিটের উপরে ৪ থেকে ৫টি ছোট ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে এবং গাছ তার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন কর্কশিটের ফাঁকা জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পারে। ফসলের প্রকার ভেদে সাধারণত ২ থেকে ৩ বার এই খাদ্য উপাদান ট্রেতে যোগ করতে হয়। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সহজেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে পস্নাস্টিক বালতি, পানির বোতল, মাটির পাতিল, ইত্যাদি ব্যবহার করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গায় সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করতে পারে। এতে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম হবে।
যে সকল ফসল হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যাবে তা হল_ পাতা জাতীয় সবজির মধ্যে লেটুস, গীমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া, বাঁধাকপি। ফল জাতীয় সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, শসা, ক্ষিরা, মেলন, স্কোয়াস, ফল স্ট্রবেরি, ফুল এ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমলিস্নকা, জারবেরা ইত্যাদি। হাইড্রোপনিক পদ্ধতির চারা উৎপাদন প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী মলিস্নক বলেন, হাইড্রোপনিকস পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের জন্য স্পঞ্জ বস্নক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত স্পঞ্জকে ৩০ সে. দ্ধ ৩০ সে. সাইজে কেটে নিতে হয়। এই স্পঞ্জকে ২.৫ সে মি. দৈঘর্্য এবং ২.৫ সে. মি. প্রস্থ বর্গাকারে, ডট ডট করে কেটে নিতে হয় এবং এর মাঝে এক সে. মি. করে কেটে প্রতিটি বর্গাকারে স্পঞ্জের মধ্যে একটি করে বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের পূর্বে বীজকে ১০% ক্যালসিয়াম অথবা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। বীজ বপনের পর স্পঞ্জকে একটি ছোট ট্রেতে রাখতে হবে। এই ট্রের মধ্যে ৫ থেকে ৮ সে. মি. পানি রাখতে হবে যাতে স্পঞ্জটি পানিতে সহজে ভাসতে পারে। চারা গজানোর ২ থেকে ৩ দিন পর প্রাথমিক অবস্থায় ৫ থেকে ১০ মি. লি. খাদ্য উপাদানে সম্বলিত দ্রবণ এক বার এবং চারা গজানোর ১০ থেকে ১২ দিন পর থেকে চারা রোপণের পূর্ব পর্যনত্ম প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ মি. লি. দ্রবণ দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে চারা রোপণের পর দ্রবণের পিএইচ মাত্রা ৫.৮ থেকে ৬.৫ -এর মধ্যে এবং ইসি মাত্রা ১.৫ থেকে ১.৯ -এর মধ্যে রাখা দরকার। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ে ওপর থেকে সুতা বা শক্ত রশি ঝুলিয়ে গাছ সোজা ও দাঁড় করিয়ে রাখতে হয় এবং পরিচর্যা সাধারণ গাছের মতই করতে হবে।
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির জন্য রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ ও তৈরির প্রক্রিয়া একটু ভিন্ন রকম। প্রতি এক হাজার লিটার পানির জন্য পটাশিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট ২৭০ গ্রাম, পটাসিয়াম নাইট্রেট ৫৮০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম নাইট্রেট এক হাজার গ্রাম, ম্যাগানেসিয়াম সালফেট ৫১০ গ্রাম, ইডিটিএ আয়রন ৮০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ৬.১০ গ্রাম, বরিক এসিড ১.৮০ গ্রাম, কপার সালফেট ০.৪০ গ্রাম, অ্যামনিয়াম মলিবটেড ০.৩৮ গ্রাম, জিংক সালফেট ০.৪৪ গ্রাম হারে পানিতে মিশিয়ে খাদ্য দ্রবণ তৈরি করতে হবে।
জলীয় খাদ্য দ্রবণ তৈরির সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে ঝঃড়পশ ঝড়ষঁঃরড়হ তৈরি করতে হবে। এই ঝঃড়পশ তৈরি করার সময় ক্যালসিয়াম নাইট্রেট এবং ঊউঞঅ ওৎড়হ কে পরিমাপ করে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে দ্রবণকে ঝঃড়পশ ঝড়ষঁঃরড়হ "অ" নামে নামকরণ করতে হবে। অবশিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্যগুলোকে একসাথে ১০ লিটার পাানিতে দ্রবীভূত করে ঝঃড়পশ ঝড়ষঁঃরড়হ "ইচ্ নামে নামকরণ করতে হবে। এক হাজার লিটার জলীয় দ্রবণ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে এক হাজার লিটার পানি ট্যাংকে নিতে হবে। তারপর ঝঃড়পশ ঝড়ষঁঃরড়হ অ থেকে ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকের পানিতে ঢালতে হবে এবং একটি অ-ধাতব দ-ের সাহায্যে নাড়াচাড়া করে ভালভাবে মেশাতে হবে। এরপর ঝঃড়পশ ঝড়ষঁঃরড়হ "ই" থেকে আগের মত ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকে নিতে হবে এবং আগের মতই অ-ধাতব দ-ের সাহয্যে পানিতে ঝঃড়পশ ঝড়ষঁঃরড়হ গুলি সমানভাবে মেশাতে হবে।
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির চাষাবাদের সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. আব্দুল হক জানান, এ পদ্ধতিতে আবাদি জমির প্রয়োজন হয় না বিধায় সারাবছর কিংবা অমৌসুমেও সবজি, ফল, ফুল চাষাবাদ করা যায়। পদ্ধতিটি মাটিবিহীন চাষ পদ্ধতি হওয়ায় মাটিবাহিত রোগ ও কৃমিজনিত রোগ হয় না। কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম হওয়ার কারণে এই পদ্ধতিতে কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে ছোট এবং বড় পরিসরে স্বাস্থ্যসন্মত এবং পরিচ্ছন্নভাবে ফসল উৎপাদন করা যায়। এটি হোম-ফার্মিং এর জন্য একটি আদর্শ প্রযুক্তি বিধায় অধিক লাভজনক, অর্থকরী ও মানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।
বিভিন্ন কারণে দেশে মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার অব্যাহত খাদ্য চাহিদা পূরণের লৰ্যে শুধু আবাদি জমির উপর নির্ভর করা যাবে না। দেশের এমনি অবস্থায় প্রয়োজন অব্যবহৃত খালি জায়গা ও পতিত জায়গা শস্য চাষের আওতায় আনা। হাইড্রোপনিকস চাষ পদ্ধতি এ ৰেত্রে সঠিকভাবে আরোপযোগ্য একটি কৌশল। এ পদ্ধতি বাড়ির ছাদে, আঙিনায়, বারান্দায় কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সহজেই চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব। এতে করে একদিকে যেমন পতিত জমি বা অব্যবহৃত জায়গার সফল ব্যবহার হবে, অন্যদিকে দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবে।
লেখক : কৃষিবিদ, বৈজ্ঞানিক কর্মকতর্াফল গবেষণা কেন্দ্র, বিনোদপুর, রাজশাহী